১২ বছরের এক শিশু। নাম মুনতাসির বিল্লাহ। দেখতে সাধারণ একজন বাচ্চার মতোই। মায়াবী মুখ, চোখে বিস্ময় আর কল্পনার জগৎ। কিন্তু তার শরীরে প্রতিনিয়ত চলছে এক নিষ্ঠুর, নির্মম ও নীরব যুদ্ধ — একটি জিনগত রোগের বিরুদ্ধে, যার নাম Duchenne Muscular Dystrophy (DMD)।
শুরুটা স্বাভাবিকই ছিলো...
মুনতাসিরের জন্ম হয়েছিলো সম্পূর্ণ স্বাভাবিকভাবেই। প্রথম কয়েক বছর সে অন্যান্য শিশুর মতোই হাঁটতে, খেলতে, কথা বলতে শেখে। পরিবারের সবার চোখে সে ছিলো আনন্দের উৎস বিশেষ করে দাদার চোখের মনি। আনুমানিক সাড়ে ৪ বছর বয়সে বাবা-মা লক্ষ্য করেন যে মুনতাসির হাঁটতে গিয়ে অস্বাভাবিক পড়ে যাচ্ছে। সিঁড়ি ভাঙতে সমস্যা হয়, দৌড়াতে পারে না, এবং মেঝে থেকে উঠতে তাকে অন্যভাবে সাহায্য নিতে হয়।
প্রথমে পরিবার ভাবেন হয়তো ভিটামিন বা ব্যায়ামের অভাব। শুরু হয় চিকিৎসকের কাছে ছোটাছুটি। অস্বাভাবিক লক্ষণগুলির কথা শুনে নিউরো সাইন্স হাসপিতালের ডাক্তারেরা প্রথমবার এই বিরল অথচ ভয়ঙ্কর জেনেটিক রোগটির নাম পরিবারকে জানান এবং পরামর্শ দেন ইন্টারনেট থেকে আরও বিস্তারিত জানার জন্য। সেই সময়ই মুনতাসিরের পরিবার প্রথমবার Duchenne Muscular Dystrophy (DMD) — সম্পর্কে জানতে পারেন। যার প্রভাবে ধীরে ধীরে শরীরের সব পেশিকে দুর্বল করে দেয়, অবশেষে জীবনহানির দিকে ঠেলে দেয়। নিউরোজেন হেলথকেয়ার (Neurogen Helthcare) এ মুনতাসিরের জেনেটিক টেস্ট করার মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে DMD ডায়াগনোসিস হয় ২০২২ সালে।
একটি জীবনের বদলে যাওয়া দিন
DMD একটি বিরল এবং বর্তমানে পর্যন্ত অসাধ্য রোগ। এটি ধীরে ধীরে পেশির শক্তি নষ্ট করে ফেলে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আক্রান্ত শিশুরা ১০-১২ বছর বয়সে হাঁটার ক্ষমতা হারায় এবং ২০ বছরের আগেই শ্বাস-প্রশ্বাস বা হৃদযন্ত্র ব্যর্থ হয়ে মারা যায় (বিভিন্ন গবেষণা তথ্যানুযায়ী)।
মুনতাসিরের পরিবারের জন্য এটি ছিলো দুঃস্বপ্নের মতো। সন্তানকে সুস্থ করে তোলার আশায় তারা দেশের সেরা ডাক্তার, হাসপাতাল, পরীক্ষা-নিরীক্ষায় সব চেষ্টা করেছেন। কিন্তু বাংলাদেশে DMD রোগের সঠিক চিকিৎসা না থাকায়, তাদের চেষ্টার পথ হয়ে পড়ে কঠিন ও ব্যয়বহুল। উন্নত চিকিৎসার জন্য ২০২৩ সালে একবার ভারত ও ভ্রমন করেন। কিন্তু সেখানেও হতাশ হতে হয়।
বর্তমান অবস্থা: হুইলচেয়ারে বন্দি, তবু স্বপ্ন দেখে
এখন মুনতাসির পুরোপুরি হাঁটার সক্ষমতা হারিয়েছে। সে নিজের বিছানা থেকেও উঠতে পারে না— আবশ্যকীয় সবকিছুতে তাকে সাহায্য করতে হয়। সে ফিজিওথেরাপি নেয়, ওষুধ খায়, ডাক্তারের পরামর্শ মেনে চলে। তবে এক জিনিস সে এখনো হারায়নি—স্বপ্ন। সে একদিন স্কুলে যেতে চায়, বন্ধুদের সঙ্গে খেলে বেড়াতে চায়, বিজ্ঞানী হতে চায়।
চিকিৎসার ভার: এক অসম লড়াই
মুনতাসিরের চিকিৎসায় প্রতিমাসে খরচ হয় প্রায় ২০–৩০ হাজার টাকা। বছরে প্রয়োজন হয় একাধিক পরীক্ষা ও বিশেষায়িত হুইলচেয়ার, যেগুলোর খরচ লাখ টাকায় গিয়ে ঠেকে। উন্নত চিকিৎসা বা জিন থেরাপির জন্য বিদেশ যেতে হলে দরকার কোটি টাকার বেশি, যা সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য অকল্পনীয়।
প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে “DMD Care Foundation Bangladesh” মুনতাসিরের বাবা-মা ও অন্যান্য DMD আক্রান্ত রোগীর অভিভাবকের প্রচেষ্টায় প্রথমবারের মত বাংলাদেশে গঠিত হচ্ছে একটি আশার নাম — “DMD Care Foundation Bangladesh”। এটি DMD আক্রান্ত শিশুদের সংগঠিত করা, চিকিৎসা, থেরাপি, পরামর্শ, এবং সরকারি-বেসরকারি সহায়তা আদায়ের একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে।
চাই সামগ্রিক সহযোগিতা ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ বাংলাদেশে এই রোগ নিয়ে সচেতনতা নেই বললেই চলে। নেই কোনও জাতীয় নীতিমালা, সহায়তা তহবিল, কিংবা জেনেটিক কাউন্সেলিং সেবা। চুপিচুপি নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে DMD আক্রান্ত শিশুরা। অথচ প্রতি বছরেই DMD আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বাড়ছে যা ভয় ও আতংকের কারন।
আমরা চাই—
• DMD রোগীদের জাতীয় পরিচয় ও ভাতা সংযুক্ত করা হোক
• চিকিৎসার জন্য বিশেষায়িত ইউনিট গড়ে তোলা হোক
• জেনেটিক টেস্ট যেন দেশে সহজলভ্য হয়
• বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকেও আহ্বান জানানো হোক
একটি শিশুর জীবন রক্ষা করুন
মুনতাসির শুধু একটি নাম নয় — সে এই দেশের অসংখ্য 'নিরব যুদ্ধরত' শিশুর প্রতিনিধি। তার জীবন যেন থেমে না যায়, তার হাসি যেন নিভে না যায় — এই প্রত্যাশায় আমরা সকলে হাতে রাখি হাত।
একটু সহযোগিতা, একটি শিশু — একটি ভবিষ্যৎ